হুগলি নদীর ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা লোহার তৈরি এই বিশালাকার কাঠামোটি শুধু কলকাতা ও হাওড়া শহরকে যুক্ত করেনি, বরং গত আট দশক ধরে হয়ে উঠেছে বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের প্রতীক। বিশ্বখ্যাত এই ‘ক্যান্টিলিভার’ সেতুটি আজও বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য বিস্ময় হিসেবে পরিচিত।
প্রকৌশলবিদ্যার অনন্য নিদর্শন
১৯৪৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই সেতুটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—নদীর মাঝে এর কোনো স্তম্ভ বা পিলার নেই। সম্পূর্ণ সেতুটি দুই তীরের দুটি মাত্র স্তম্ভের ওপর ভর করে ঝুলন্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রায় ২৬,৫০০ টন ইস্পাত দিয়ে তৈরি এই সেতুটিতে কোনো নাট বা বল্টু ব্যবহার করা হয়নি; পুরো কাঠামোটি যুক্ত করা হয়েছে বিশেষ ‘রিভেট’ (Rivet) প্রযুক্তির সাহায্যে। সেতুর সিংহভাগ উচ্চমানের ইস্পাত সরবরাহ করেছিল ভারতের টাটা স্টিল।
কলকাতার ব্যস্ততম জীবনরেখা
প্রতিদিন গড়ে এক লাখেরও বেশি যানবাহন এবং লক্ষাধিক পথচারী এই সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করেন। রেলযাত্রীদের জন্য হাওড়া স্টেশন থেকে কলকাতায় প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে এটি দীর্ঘদিন ধরে শহরের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। ১৯৬৫ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মরণে সেতুটির আনুষ্ঠানিক নাম পরিবর্তন করে ‘রবীন্দ্র সেতু’ রাখা হলেও, বিশ্বজুড়ে এটি এখনও ‘হাওড়া ব্রিজ’ নামেই বেশি পরিচিত।
রক্ষণাবেক্ষণ ও বর্তমান চিত্র
কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের (বর্তমানে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট) তত্ত্বাবধানে এই ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। ট্রাফিকের অতিরিক্ত চাপ ও পরিবেশগত ক্ষয় রোধে বিভিন্ন সময়ে সেতুটির আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। সম্প্রতি যুক্ত হওয়া ডায়নামিক এলইডি লাইটিং সন্ধ্যার পর ব্রিজটিকে এক মোহময় রূপ দান করে, যা দেখতে দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক ভিড় জমান গঙ্গার ঘাটে।
যুগের পরিবর্তন আর আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির মাঝেও হাওড়া ব্রিজ কেবল একটি সেতু নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের গল্প আর কলকাতার সমৃদ্ধ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।